রবিবার , ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

খালেদাসহ দেড় ডজন প্রার্থী হতে পারবেন না

দুই বছরের বেশি দণ্ডিত ব্যক্তিদের আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই- হাইকোর্টের দেওয়া উপরোক্ত পর্যবেক্ষণসহ এ-সংক্রান্ত আদেশ বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দেড় ডজন রাজনীতিবিদ এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছেন না। এর মধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগের তিন সাবেক এমপিও রয়েছেন। তাদের মধ্যে হাজী সেলিম নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তথ্যানুযায়ী, দণ্ডিত হওয়ার পর উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন রয়েছে এমন রাজনীতিবিদরা হলেন- বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক সাংসদ হাজী মোহাম্মদ সেলিম, হাজী মকবুল আহমেদ, জয়নাল আহমেদ হাজারী, বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ও তার ছেলে ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান ও তার স্ত্রী সাবেরা আমান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সাংসদ ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ঝিনাইদহ-১ আসনের সাবেক সাংসদ মো. আব্দুল ওহাব, ঝিনাইদহ-২-এর সাবেক সাংসদ ও ঝিনাইদহ বিএনপির সভাপতি মো. মশিউর রহমান, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, একেএম মোশাররফ হোসেন, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা প্রমুখ। তাদের প্রত্যেকের দদ্ধেই উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে খালেদা জিয়াসহ কয়েকজন বিএনপি নেতার সাজা হাইকোর্ট বহাল রাখার পর ওই রায়ের বিরুদ্ধে তাদের করা আবেদন আপিল বিভাগেও বিচারাধীন রয়েছে। তারা নির্বাচন করতে পারবেন না।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, বিএনপি নেতা সাবেক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান, ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, শাহজাহান চৌধুরীসহ (জামায়াতে ইসলামী) কয়েকজন নেতা হাইকোর্টে খালাস পেলেও এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে দুদক, যা এখনও বিচারাধীন। একজন আইনজীবী দাবি করেছেন, ঋণ বা বিল খেলাপি না হলে এবং অন্য কোনো আইনগত প্রশ্ন না থাকলে তাদের নির্বাচন করতে কোনো সমস্যা হবে না। তবে অন্য এক আইনজীবী বলেছেন, বিষয়টি স্পষ্ট নয়। ফলে খালাস পেলেও তারা নির্বাচন করতে পারবেন কি-না সেটা সর্বোচ্চ আদালতই বলতে পারবেন।

এর আগে গত মঙ্গলবার পৃথক দুর্নীতির মামলায় দুই বছরের বেশি দণ্ডিত বিএনপির পাঁচ নেতার দণ্ড ও সাজা স্থগিতের আবেদন খারিজ করেন হাইকোর্ট। পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ‘সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কারও দুই বছরের বেশি সাজা বা দ সেই দ বা সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না; যতক্ষণ না আপিল বিভাগ ওই রায় বাতিল বা স্থগিত করে তাকে জামিন দেন। কারণ কোনো আদালতের দেওয়া সাজার বিরুদ্ধে আপিল বিচারাধীন থাকলেও দএই দণ্ড কার্যকর থাকে। এটা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরোপুরি বাধা। এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের বিধানই প্রাধান্য পাবে।’

এরপর ওইদিনই হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেন বিএনপি নেতা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। পরে চেম্বার আদালত ওই আবেদনটি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।

গতকাল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে করা আবেদনের শুনানি নিয়ে ‘নো অর্ডার’ দেন। এর ফলে হাইকোর্টের আদেশই বহাল রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের আইনজ্ঞরা। তারা বলেছেন, দুই বছরের বেশি দণ্ডিতদের আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কেউ আর জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। আপিল বিভাগে বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ায় আর কোনো আইনি পথ তাদের সামনে খোলা নেই বলেও জানিয়েছেন সংশ্নিষ্ট আইনজীবীরা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী গতকাল বুধবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হয়েছে। মনোনয়নপত্র বৈধ না অবৈধ, তা জানা যাবে আগামী ২ ডিসেম্বর। এরপর নির্বাচন কমিশন ও উচ্চ আদালতে মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে আপিল করা যাবে। তবে গতকাল আপিল বিভাগে দুই বছরের বেশি দণ্ডিতদের বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ বহাল থাকার পর আইনি সুযোগ আর নেই বলেই মনে করছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরীর দাবি, দণ্ডিতরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি-না, সেটি রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করছে। কারণ কেউ নির্বাচন করতে পারবেন কি-না, সেটা পুরোপুরি রিটার্নিং কর্মকর্তার এখতিয়ার।

আদালতে বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা এবং দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান।

সংবিধানের ৬৬(২ঘ) অনুসারে হাইকোর্ট যে পর্যবেক্ষণ ও আদেশ দিয়েছেন তার বাইরে গিয়ে কোনোভাবেই রিটার্নিং কর্মকর্তার দণ্ডিতদের মনোনয়নপত্র বৈধ করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের আদেশই বহাল রয়েছে। নির্বাচন কমিশন আদালতের এ আদেশ মানতে বাধ্য। ফলে বিএনপির ওই পাঁচ নেতা, খালেদা জিয়াসহ দুই বছরের বেশি সাজায় দি ত কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অনূ্যন ২ বৎসরের কারাদে দি ত হন এবং তাহার মুক্তি লাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে।’

সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুসারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অংশ নিতে হলে মুক্তি পাওয়ার পরও তাকে আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এর ব্যাখ্যায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এই পাঁচ বছর গণনা শুরু হবে যেদিন তার সাজা বাতিল হয়ে গেল, সেদিন থেকে। সেটা যে আদালত থেকেই হোক না কেন। আপিল বিভাগ থেকে তার সাজা বাতিল হতে পারে, আবার তিনি কারাভোগ করেও মুক্তি পেতে পারেন।

আরেক প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া খালাস পেয়েছেন, কিন্তু তাকেও এখন নির্বাচনে অংশ নিতে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। খালেদা জিয়ার জন্য এই বিধান নতুন করে সংযোজন করা হয়নি। সংবিধানের ৬৬(২ঘ) অনুচ্ছেদ আগে থেকেই রয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ আগে যারা আপিল বিচারাধীন রেখে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(২ঘ) অনুচ্ছেদ কেন কার্যকর হয়নি- এমন প্রশ্নে মাহবুবে আলম বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সংবিধানে যেটা লেখা আছে, আদালতকে সেটা জানানো আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। সংবিধান হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। তখন হয়তো বিষয়টি উপস্থাপিত হয়নি।

তবে এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বিএনপি চেয়ারপাসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, প্রয়াত সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল তার এক রায়ে বলেছিলেন, আপিল হলো বিচারের চলমান প্রক্রিয়া। কোনো দ ই চূড়ান্ত হবে না, যতক্ষণ না আপিল বিভাগ চূড়ান্ত করে। তাই আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর না হওয়ার কারণে দণ্ডিতদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা থাকার কথা নয়। এ ব্যাপারে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Comments

Check Also

রাজধানীর গুলশানে পুলিশ প্লাজায় আগুন

রাজধানীর গুলশানের পুলিশ প্লাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাতে পঞ্চম তলায় ফুড কোর্টের একটি দোকানে …