বুধবার , ১৪ নভেম্বর ২০১৮

গ্যাসের হাতছানি সাগরে

বঙ্গোপসাগরে ব্লক ডিএস-১২তে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে অনুসন্ধানকারী বিদেশি কোম্পানি। গভীর সমুদ্রের এই এলাকায় দ্বিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ (২ডি সাইসমিক সার্ভে) শেষে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি পোসকো দাইয়ু এমনটি জানিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

দাইয়ু তিন হাজার ৫৬০ লাইন কিলোমিটার জরিপের তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে এখানে পাঁচটি লিড (মাটির নিচে সম্ভাবনাময় গ্যাসের কাঠামো) শনাক্তের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে তিনটিকে বেশ সম্ভাবনাময় বলে তারা উল্লেখ করেছে।

তেল-গ্যাসের অবস্থান আরও নিশ্চিত হতে আগামী নভেম্বর থেকে দুই হাজার লাইন কিলোমিটার তৃতীয় মাত্রার (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ করা হবে। এই ব্লকের পাশেই মিয়ানমার তার একটি সমুদ্র ব্লকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে বলে জানিয়েছে কোরিয়ান কোম্পানি।

গভীর সাগরে সাধারণত গ্যাসের মজুদ একটু বেশিই হয়ে থাকে। এখানে কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। বর্তমানে অনেক বেশি দামে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এই এলএনজি বাংলাদেশের সার্বিক শিল্প উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, গভীর সাগরে দ্রুত অনুসন্ধান করে তেল-গ্যাস আবিস্কার করতে হবে। দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বর্তমানে সাগরই একমাত্র সম্ভাবনাময়  এলাকা।

ব্লক-১২তে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দাইয়ু করপোরেশনের সঙ্গে ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সই করে পেট্রেবাংলা। ব্লকটি সমুদ্র উপকূল থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে গভীর সাগরে। সেখানে পানির গভীরতা গড়ে এক হাজার ৭০০ মিটার।

এ বিষয়ে ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমাম সমকালকে বলেন, সাধারণত সাগরে কোনো কাঠামোতে এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) মজুদ থাকলেই তাকে ভালো ক্ষেত্র বলে বিবেচনা করা হয়। এখানে বলা হচ্ছে, পাঁচটি লিড পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটিতে এক টিসিএফ পেলে আরও একটিতে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বাংলাদেশের ডিএস-১২ ব্লকের পাশেই মিয়ানমারের সমুদ্র ব্লক এডি-৭-এর থালিন-১-এ গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কৃত হয়েছে। সেখানেও কাজ করছে দাইয়ু। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে থালিন-১-এ গ্যাস প্রাপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। থালিন-১-এ সাড়ে চার ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আছে। এখান থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে।

সাগরে গ্যাস পাওয়া গেলে সাধারণত দুটি প্রক্রিয়ায় তা তীরে আনা হয়ে থাকে। একটি হলো পাইপলাইন নির্মাণ, অন্যটি হলো গ্যাসক্ষেত্রেটির কাছে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন। সাগরে এক কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের জন্য গড়ে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। অন্যদিকে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণে খরচ কমপক্ষে ৪০০ মিলিয়ন ডলার। গ্যাস মজুদের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কোন পদ্ধতি ব্যবহার হবে। ভারতে ২০০ কিলোমিটার সাবসি (সাগরের নিচে) পাইপলাইন রয়েছে।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মোট আয়তন এক লাখ ১১ হাজার ১২৬ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে অগভীর সমুদ্র রয়েছে ৫৮ হাজার ৭২৯ বর্গকিলোমিটার আর গভীর সমুদ্র রয়েছে ৫২ হাজার ৩৯৭ বর্গকিলোমিটার। পেট্রোবাংলা সমুদ্র এলাকাকে ২৬টি ব্লকে ভাগ করেছে। এর মধ্যে ১১টি অগভীর আর ১৫টি পড়েছে গভীর সমুদ্রে। মাত্র চারটি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চলছে। দাইয়ু ছাড়াও ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি এসএস-০৪ এবং এসএস-০৯ ব্লকে এবং সান্তোস ও ক্রিস এনার্জি এসএস-১১ নম্বর ব্লকে কাজ করছে।

এর আগে বঙ্গোপসাগর উপকূলে সাঙ্গু থেকে গ্যাস তোলা হয়েছে। সাঙ্গু ছাড়াও বঙ্গোপসাগরে মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস ১০ এবং ১১ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য জরিপ চালায়। ওই জরিপেও ভালো ফল পাওয়ার কথা জানায় মার্কিন কোম্পানিটি। কিন্তু গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে কনোকোর দাবি সরকার মেনে না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটি ব্লক দুটি ফেলে চলে যায়।

Comments

Check Also

সাভারে এক রোগীর মৃত্যু, সার্জন না হয়েও অপারেশন

সাভারে সার্জন না হয়েও ভুল অপারেশন করায় এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার …