Tuesday , 19 March 2019

১৪৪০ টাকা করতে চায় দুই চুলার গ্যাসের দাম

বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাবে দেশের শিল্পখাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায় মুনাফার হার কমছে। এর মধ্যে বার বার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে শিল্প খাতের বিকাশ রুদ্ধ হবে। দেউলিয়া হয়ে যাবেন উদ্যোক্তারা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই গ্যাসের মূল্য যৌক্তিক হওয়া উচিত। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা কমানোর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত।

গতকাল মঙ্গলবার তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবিত গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আবেদনের গণশুনানিতে শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেছেন। রাজধানীর টিসিবি মিলনায়তনে এই শুনানির আয়োজন করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শুনানিতে কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য মিজানুর রহমান, মাহমদুউল হক ভুঁইয়া, রহমান মুর্শেদ, আব্দুল আজিজ খান উপস্থিত ছিলেন।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে চাইলে শিল্পে কর্ম সংস্থান ছাড়া বিকল্প নেই। এজন্য ৭০ বিলিয়ন ডলার অর্থ প্রয়োজন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে মজুরি ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উদ্যোক্তাদের ২৯ ভাগ ব্যয় বেড়েছে। এখন আবার গ্যাসের দাম বাড়ালে উদ্যোক্তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে। শিল্প উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। এতে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। তাই গ্যাসের দাম বাড়ানো উচিত নয়। এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিলেও সরকারের স্বল্প মেয়াদি শিল্পনীতি বেশ অগোছালো। তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নীতি ভালো। শুধু দাম বাড়ানোর সময় তাদের ডাকা হবে আর বিশ্ববাজারে দাম কমলে কমানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে না, এই চর্চা ঠিক নয়।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আবেদন করার পর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সবেমাত্র গ্যাস সংযোগ পেতে শুরু করেছে। এসময়ে দাম বৃদ্ধি কার স্বার্থে? গণশুনানি হাস্যকর। সারা বিশ্বে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কমেনি।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন-বিটিএমএ’র সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, পোশাক খাত যে ৪০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করছে তার পেছনে তাদের ১৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। বার বার গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু তারা দুই তিন বছর থেকে যে ইভিসি (ইলেকট্রিক ভলিউম কারেকটর) মিটার চাইছেন তা দেওয়া হচ্ছে না। ফলে গ্যাসের নিম্নচাপ, অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের পরও অতিরিক্ত বিল দিতে হচ্ছে। এতে উত্পাদন খরচ বাড়ছে। এখন আবার গ্যাসের দাম বাড়লে শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাবি বিইআরসির কাছে দিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, আগামী এপ্রিলে নতুন এলএনজি আসতে পারবে না। এই বিষয়টি সরকার যেমন জানে, বিইআরসিও বোঝে যে গ্যাস আসেইনি তার ওপর ভিত্তি করে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ অযৌক্তিক ও অন্যায়। তিনি বলেন, এলএনজির জন্য সরকারকে প্রতি ঘনমিটারে এক টাকা করে ভর্তুকি দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সে অর্থ দেওয়া হয়নি। জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলে সাত হাজার ৫০০ কোটি টাকা পড়ে আছে। সরকার যতদিন অর্থ না দেয় ততদিন এই তহবিল থেকে ঋণ দিয়ে এলএনজির ব্যয় নির্বাহ করা যায়। সরকার বলছে ধারাবাহিকভাবে ৪৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি আসবে। এতে কি পরিমাণ ব্যয় বাড়বে তা ভোক্তার জানা উচিত।

গতকাল সকালে তিতাস গ্যাসের ও বিকালে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তিতাস গড়ে ১০২.৮৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটি বাসা বাড়িতে একচুলার বর্তমান দর ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫০টাকা, দুই চুলার ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৪০ টাকা করার আবেদন করেছে। কোম্পানিটি বিদ্যুতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম তিন টাকা ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে নয় টাকা ৭৪ পয়সা, সিএনজিতে ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ টাকা, আবাসিকের প্রি-পেইড মিটারে নয় টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা ৪১ পয়সা, সার উত্পাদনে দুই টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে আট টাকা ৪৪ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে নয় টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা চার পয়সা, শিল্পে সাত টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৪ টাকা পাঁচ পয়সা, বাণিজ্যিকে ১৭ টাকার পরিবর্তে ২৪ টাকা পাঁচ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে বিতরণ চার্জ বাড়ানোর জন্যও প্রস্তাবনা দিয়েছে। তিতাস বিদ্যমান বিতরণ চার্জ ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে চলতি অর্থবছরে ৫৩ পয়সা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫৫ পয়সা করার আবেদন জানিয়েছে। তবে বিইআরসির মূল্যায়ন কমিটি বলেছে, চলতি অর্থবছর সমাপ্তির পর প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে তিতাসের বিতরণ চার্জ বাড়ানো যৌক্তিক হবে। ঢাকা ও এর নিকটবর্তী ১৪টি জেলায় গ্যাস বিতরণ করে তিতাস।

আরও পড়ুনঃ মেশিন অত্যাধুনিক হলেও দায়িত্ব পালন করেন না অপারেটররা

শুনানিতে অংশ নিয়ে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি একই হারে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তারা বিতরণ মার্জিন ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে চলতি অর্থবছরে এক টাকা ২৫ পয়সা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে এক টাকা ৩০ পয়সা করার আবেদন জানিয়েছে।

Comments

Check Also

আগামী দুইদিন বজ্রবৃষ্টি হতে পারে শিলাসহ

আগামী দুইদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে শিলা বৃষ্টিসহ বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, মঙ্গলবার পর্যন্ত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *