Saturday , 19 September 2020

৭ সন্তান মিলেও দিতে পারেনি ভরণ-পোষণ, ঝুপড়িতেই কেটে গেল বছর তিনেক !

প্রতিবন্ধী ফজলুল হক হাওলাদার ওরফে ফজলু। বয়স ৬০-এর কাছাকাছি। পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার কলারন গ্রামের এসবিআই ইট ভাটা সংলগ্ন পানগুছি নদীর পাড়ে একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস তার। স্ত্রী, ৫ মেয়ে আর দুই ছেলে নিয়েই ফজলু মিয়ার জীবন সংসার। একে একে মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। আর দুই ছেলে তাদের স্ত্রী সন্তান নিয়ে আলাদা থাকছেন। তারা দুজনেই পেশায় জেলে। সংসারের টানাপড়েনের কারণে পিতা মাতার ভরণ-পোষণ করাতে পারছেন না তাঁরা। এজন্য জীবিকার টানে নিজের পুরোনো বাড়ি ছেড়ে স্ত্রী আলেয়া বেগমকে (৪০) নিয়েই বছর তিনেক আগে নদীর পাড়ে কোনমতে বসতি গড়েছেন ফজলুল হক।

তবে ১৬ বছর আগে গ্যাংগিন রোগে বাম পায়ে পঁচন ধরে এই ফজলু হাওলাদারের। আর্থিক অভাব অনটনের কারণে সে সময় নিজের ভালো চিকিৎসা করাতে পারেননি তিনি। যার কারণে এক সময় কেটে ফেলতে হয় তার এ পা। সেই থেকেই এক পা হারানো এ মানুষটিকে চলতে হচ্ছে ক্রাচে ভর করে। আর এ অবস্থায় একে একে কেটে গেছে তার প্রায় ১৬ বছর। তার দুই ছেলে আলমগীর (২৫) এবং এমদাদুল হক (২৩) নদীতে মাছ ধরে কোনমতে জীবন চালাচ্ছেন। স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে তার দুই ছেলে থাকছেন পুরোনো বাড়িতে।

এদিকে নিজের ভরণ-পোষণ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ায় কোন উপায় না পেয়ে সংসার চালাতে তিন বছর আগে ফজলু মিয়া নিজেই বেছে নেন নদীতে মাছ ধরার পেশা। তাই কচা আর পানগুছি নদীর মোহনায় প্রতিদিন জাল ফেলে জীবিকা নির্বাহ করে চলে আসছে তার এ সংসার। রোদ আর ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরেন তিনি। নৌকা আর জালই তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। নদীতে সবসময় মাছ না পাওয়ায় খেয়ে না খেয়ে চলে স্ত্রী আলেয়া বেগম (৪০) আর তার নিজের পেট।

তার বসতির আশপাশে আধা কিলোমিটারের মধ্যে নেই কোন বাড়িঘর। তাই স্বাভাবিক ভাবে কোন জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি কোন সংস্থা কারো নজর পড়েনি এ অসহায় পরিবারটির দিকে। জীবিকার প্রয়োজনে জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় বসতি গড়ায় সরকারি-বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এ মানুষটি। দীর্ঘ ১৬ বছর আগে পা হারিয়ে তার কপালে এখন পর্যন্ত জোটেনি কোন প্রতিবন্ধী ভাতা।

নিজের অসহায় জীবনের কথা তুলে ধরে ফজলু হাওলাদার সাংবাদিকদের বলেন, মোর একটা পাও নাই। এই অবস্থায় নদীতে মাছ ধইররা জীবন চালাতে আছি। হের উপর একটা ভাঙ্গাচোরা ঝুপড়ি ঘরে থাহি। মাইয়া পোলাগো সোংসারেও টানাটানি। হেরাও ঠিকমত খাইতে পারে না। সরকার মোরে প্রতিবন্ধী ভাতা আর থাহার পিন্নে যদি একটা ঘর এবং চলাফেরা করার পিন্নে একটা হুইল চেয়ার দেতে হেইলে মুই খুব খুশি হইতাম।

স্থানীয় খোকন নামে এক যুবক বলেন, এই ফজলু চাচায় খুব অসহায় অবস্থায় জীবন কাটাইতে আছে। এই জায়গায় সচারাচার কেউ আয়না। তাই তেমন কোন সাহায্য সহযোগিতা পাইতে আছে না হে।

ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল হাই জোমাদ্দার জানান, প্রতিবন্ধী ঐ অসহায় জেলে একটি বিচ্ছিন্ন এলাকায় বসবাস করেন। তার নামে শুধু জেলে কার্ড রয়েছে। এ ছাড়া তাকে তালিকাভুক্ত করে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন আছে। কিন্তু সম্প্রতি সরকারিভাবে ঘর দেওয়ার যে তালিকা করা হয়েছে তাতে সম্ভবত তার নাম নেই। তবে শুপারিশ করে তার নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার জন্য চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মাদ আল মুজাহিদ জানান, অসহায় ঐ জেলে আবেদন করলে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া অসহায় ব্যক্তিদের সরকারিভাবে ঘর দেওয়ার যে তালিকা করা হচ্ছে তাতে তার নাম না থাকলে সংশ্লিস্ট এলাকায় খোঁজ খবর নিয়ে বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে জানান।

Comments

Check Also

একের পর এক খুন হচ্ছেন পুলিশ সোর্স থেকে

অপরাধীদের ধরতে ‘সোর্সনির্ভর’ তদন্ত করে পুলিশ। সোর্সদের দেওয়া তথ্য নিয়ে পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করে। কোনো …