খাগড়াছড়ির রামগড়ে প্রাচীনতম একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা দুই লাখ ৫৮ হাজার টাকায় নিলামের বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ। প্রাচীন স্থাপনা সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিয়ে বিক্রির এমন সিদ্ধান্তে স্থানীয় ও বিশিষ্টজনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
দ্রুত এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে স্থাপনাটি সংরক্ষণে জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন স্থানীয়রা।
আলোচনায় আসা ওই স্থাপনাটি বর্তমানে ‘রামগড় রেস্ট হাউস’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মূলত এটি ১৯২০ সালে গঠিত প্রাচীন ‘মহকুমার’ একটি প্রাচীনতম নিদর্শন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ ঐতিহাসিক স্থাপনা রামগড় রেস্ট হাউসটি অপসরণের জন্য নিলামে বিক্রির দরপত্র আহবান করে। পরে খাগড়াছড়ি সদরের কলেজ গেটের নুরুল আলম নামে এক দরদাতার কাছে দুই লাখ ৫৮ হাজার টাকায় রেস্ট হাউস ভবনটি বিক্রি করা হয়।
এদিকে, রামগড়ের মূল্যবান নিদর্শন নিলামে বিক্রির খবর প্রকাশ হলে স্থানীয় সচেতন নাগরিকের মধ্যে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, মহকুমা আমলে শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিশালায়তনের লেকঘেঁষে এক প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে স্থাপনাটি নির্মিত হয়। পরে ১৯৭৬ সালের ৮ ডিসেম্বর রামগড় হানাদারমুক্ত দিবসের ঐতিহাসিক দিনে তৎকালীন অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা বোর্ডের প্রশাসক আলী হায়দর খান ‘রামগড় জেলা বোর্ড বিশ্রামাগার’ নামে এ রেস্ট হাউসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। টিনশেডের দৃষ্টিনন্দন রেস্ট হাউসটি প্রাচীন এই জনপদের বাসিন্দাদের কাছে ‘ইতিহাসের ধারক’ হিসেবে পরিচিত।
প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ও সাবেক জেলা তথ্য কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) সুরেশ মোহন ত্রিপুরা বলেন, এ স্থাপনাটি যেমন মহকুমা আমলের স্মৃতিবহন করছে, তেমনি দেশ ও বিদেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের স্মৃতি বিজড়িত। আশির দশকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান এ রেস্ট হাউসে অবস্থান করেছিলেন। ভারতের ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপালসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্টজনরা এসেছিলেন এখানে।
রামগড় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাফায়াত মোর্শেদ ভুইয়া বলেন, এই ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাদের গর্ব ও আবেগের নিদর্শন। এটি ধ্বংস করতে আমরা দেবো না।’
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ও মারমা উন্নয়ন সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মংপ্রু চৌধুরী বলেন, রেস্ট হাউসটি মহকুমা আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি ধ্বংস নয়, সংরক্ষণ করতে হবে।
রামগড় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, ঐতিহ্যবাহী রেস্ট হাউসটি বিক্রির সিদ্ধান্ত বাতিল করে এটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে রামগড় প্রেসক্লাব গত বৃহস্পতিবার চিঠি পাঠিয়েছে।
রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শামীম বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনাটি অপসারণের সিদ্ধান্তের খবরে নাগরিক সমাজের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, গত ১৪ অক্টোবর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (সিনিয়র সহকারী সচিব) মো. আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ রেস্ট হাউসটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ‘রামগড় রেস্ট হাউস সংরক্ষণে সচেতন নাগরিক সমাজের দাবির বিষয়ে পরিষদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের নিয়ে বৈঠকে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’
প্রসঙ্গত, ‘মহকুমা’ বাংলাদেশের একটি বিলুপ্ত প্রশাসনিক উপ-বিভাগ। থানা ও জেলার মধ্যবর্তী প্রশাসনিক একাংশ হিসেবে মহকুমা প্রথা চালু হয় ১৮৬১ সালে। যা কয়েকটি থানার সমন্বয়ে গঠিত হতো। ১৯৮২-৮৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মহকুমা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। এই সময়ে বাংলাদেশে অন্তত ৬৪টি মহকুমা ছিল। এর মধ্যে রামগড় মহকুমা একটি। মহকুমা প্রশাসক বা এসডিও ছিলেন মহকুমার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
১৯২০ সালে ব্রিটিশ সরকার রামগড় থানাকে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার (জেলা সদর ছিল রাঙ্গামাটি) দ্বিতীয় মহকুমা বা সাব-ডিভিশন হিসেবে উন্নীত করে। এর ১-২ বছর আগেই রামগড় থানা সদরে (বর্তমান উপজেলা পরিষদ সংলগ্নে) ফেনী নদীর কূল ঘেঁষে নির্মাণ করা হয় মহকুমা প্রশাসকের (এসডিও) এই অফিস ও বাসভবন (বাংলো)।
















